একটি প্রশ্নপত্রও যে গোটা সমাজে আলোচনার বিষয় হয়ে উঠতে পারে, তার সাম্প্রতিক উদাহরণ যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের স্নাতক স্তরের ভর্তি পরীক্ষা। সমাজমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এই প্রশ্নপত্র নিয়ে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে বিস্তর আলোচনা। কারণ, এই প্রশ্নপত্রে নেই মুখস্থ তথ্য উগরে দেওয়ার চাপ, নেই নির্দিষ্ট পাঠ্যবইয়ের অধ্যায় ধরে উত্তর লেখার বাধ্যবাধকতা। বরং পরীক্ষার্থীদের নিজের মতো করে ভাবতে, অনুভব করতে এবং সেই ভাবনাকে ভাষায় প্রকাশ করতে উৎসাহ দেওয়া হয়েছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক রাজ্যেশ্বর সিনহা জানিয়েছেন, এই পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য কোনও শিক্ষার্থীর মুখস্থ জ্ঞান যাচাই করা নয়। তাঁর কথায়, “কিছুই পড়ে আসতে হবে না, কারণ আমি তোমাকে পড়াব। আমি শুধু দেখতে চাই, তুমি নিজে কতটা ভাবতে পারো এবং সেই ভাবনাকে ভাষায় কতটা প্রকাশ করতে পারো।” এই বক্তব্যই স্পষ্ট করে দেয়, পরীক্ষাটির লক্ষ্য প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতির বাইরে গিয়ে শিক্ষার্থীর স্বাধীন চিন্তাশক্তি, সংবেদনশীলতা এবং ভাষা ব্যবহারের দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া।
অধ্যাপক সিনহার মতে, প্রত্যেক শিক্ষার্থীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক পটভূমি এক নয়। কেউ শহর থেকে আসে, কেউ গ্রাম থেকে, কেউ পাহাড় বা সমুদ্রঘেরা অঞ্চল থেকে, আবার কেউ মফস্বল থেকে। সবার অভিজ্ঞতা, দেখা-শোনা, বেড়ে ওঠা এবং ভাষাবোধও আলাদা। সেই কারণেই এমন প্রশ্ন তৈরি করা হয়েছে, যাতে যে কোনও প্রান্তের শিক্ষার্থী নিজের অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি এবং অনুভূতি থেকে উত্তর লিখতে পারে। অর্থাৎ, এখানে পরীক্ষার মাপকাঠি কেবল তথ্যভাণ্ডার নয়; বরং একজন পরীক্ষার্থী কতটা নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভাবতে পারে এবং তা ভাষায় রূপ দিতে পারে, সেটাই বড় হয়ে উঠেছে।
এই প্রশ্নপত্রের বিশেষত্ব এখানেই যে, এটি শিক্ষাকে কেবল তথ্য মুখস্থ করার প্রক্রিয়া হিসেবে দেখে না। বরং শিক্ষা যে চিন্তা, প্রশ্ন, অনুভব এবং প্রকাশের এক সম্মিলিত অনুশীলন—সেই বার্তাই যেন নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে যাদবপুরের বাংলা বিভাগের এই উদ্যোগ। এমন সময়ে, যখন পরীক্ষাকে ঘিরে নম্বর, সিলেবাস আর মুখস্থ নির্ভর প্রস্তুতির চাপ বাড়ছে, তখন এই ধরনের প্রশ্নপত্র অন্যরকম দৃষ্টান্ত তৈরি করছে বলেই মনে করছেন অনেকেই।
সমাজমাধ্যমে প্রশ্নপত্রটি ভাইরাল হওয়ার পর বহু মানুষ এটিকে স্বাগত জানিয়েছেন। অনেকে বলছেন, এই ধরনের প্রশ্নই প্রকৃত অর্থে একজন শিক্ষার্থীর সৃজনশীলতা ও চিন্তার জগৎকে যাচাই করতে পারে। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, শিক্ষা ব্যবস্থার বৃহত্তর পরিসরেও এমন ভাবনার জায়গা তৈরি হওয়া দরকার, যেখানে পরীক্ষার্থীকে কেবল ‘সঠিক উত্তর’ দেওয়ার যন্ত্র হিসেবে না দেখে, একজন চিন্তাশীল মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করা হবে।
সব মিলিয়ে, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এই ব্যতিক্রমী প্রশ্নপত্র আবারও মনে করিয়ে দিল—শিক্ষা শুধু তথ্য মুখস্থ করার নাম নয়। প্রকৃত শিক্ষা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, ভাবতে শেখায় এবং নিজের অভিব্যক্তিকে সম্মান করতে শেখায়। আর সেই কারণেই একটি সাধারণ ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও আজ বৃহত্তর সামাজিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
